২০২৫ সালের জেলাভিত্তিক পশু কোরবানির হিসাবে এবারো আনুপাতিক হারে ২০ কোটি টাকার লবণ মিল মালিকদের মাধ্যমে দেয়া হবে। তবে সাম্প্রতিক ভারি বর্ষণে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় লবণের দাম মণপ্রতি (৪৪ কেজি হিসাব ধরে) ৬০ টাকা বেড়ে গেছে। এতে বিগত বছরের চেয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের পরিমাণ কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালে দেশব্যাপী ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ঈদুল আজহার এক মাস আগে সিদ্ধান্ত নেয়ায় শেষ পর্যন্ত ১১ হাজার ৫৭১ টন লবণ বিতরণ করা সম্ভব হয়। সরবরাহকৃত লবণের পরিবহন ব্যয়সহ দাম ছিল ২০ কোটি টাকা। শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে অব্যবস্থাপনা ও জেলাভিত্তিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বিঘ্নিত হয়। এসব জটিলতা এড়াতে এবার ঈদুল আজহার দুই মাস আগেই লবণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন। নভেম্বরে শুরু হওয়া এ মৌসুমে সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৭ লাখ ৬৮ হাজার টন সংগ্রহ করা গেছে। এর আগে ২৬ এপ্রিল থেকে বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়া বিলম্বিত বৃষ্টির কারণে মৌসুমের প্রথমার্ধে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে লবণ সরবরাহ করতে পারেননি চাষীরা। ১৫ মে পর্যন্ত উৎপাদন মৌসুম নির্ধারণ করা আছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আরো চার-পাঁচ লাখ টন লবণ সংগ্রহের আশা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি ও আকস্মিক বৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কয়েক দিনের ব্যবধানে মিল ও সরবরাহ পর্যায়ে লবণের দাম বেড়ে গেছে।
চট্টগ্রামের মেসার্স লাল মিয়া সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আসাদ আসিফ বণিক বার্তাকে বলেন, বৃষ্টির কারণে এক সপ্তাহ লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া মৌসুমের শেষ পর্যায়েও লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে লবণ উৎপাদন। সাম্প্রতিক বিরূপ আবহাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় কোরবানি সামনে রেখে লবণের দাম বেড়ে গেছে। সরবরাহ না বাড়লে কোরবানির ঈদে পশু চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল লবণের সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
মৌসুমের শুরুতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ৬৯ হাজার ১৯৮ একর জমি চাষের জন্য নির্ধারণ করা হয়। এসব জমিতে মোট ৪১ হাজার ৩৫৫ চাষী উৎপাদনে রয়েছেন। এক সপ্তাহ আগে মাঠ পর্যায়ে মণপ্রতি লবণ বিক্রি হয়েছে ২৩০-২৪০ টাকায়। বর্তমানে তা বেড়ে ২৫৫-২৬০ টাকায় ঠেকেছে। বৃষ্টির কারণে উৎপাদনে ধস ও ঈদ ঘনিয়ে আসায় বিপণন বা মিল পর্যায়ে লবণের দাম মণপ্রতি ৫০-৬০ টাকা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিনশ টাকায় উঠেছে। তবে দাম বাড়লেও মাঠ পর্যায়ে চাষীরা এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না বলে মনে করছে বিসিক।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে টনপ্রতি (পরিবহন খরচসহ) সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা দরে লবণ সরবরাহের কার্যাদেশ দেয় বিসিক। সংস্থাটির সারা দেশে নিবন্ধিত ২৭০ মিল মালিককে এ সুযোগ দেয়া হয়। যদিও ওই সময়ে মিলভেদে লবণ সরবরাহে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছিলেন মিল মালিকদের অনেকে। এ কারণে চলতি বছর সমহারে সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গত বছর সারা দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম থাকায় প্রচুর পরিমাণে পচে নষ্ট হয়। মূলত মসজিদ, মাদরাসাসহ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে চামড়া জমা হলেও লবণের অভাবে তা নষ্ট হয়। এজন্য সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিসিক কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের উদ্দেশে সারা দেশের লবণ মিল মালিকদের তালিকা চেয়ে পাঠায় বিসিক। বিসিকের লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেনের দেয়া ওই চিঠিতে শুধু নিবন্ধিত ও উৎপাদন চলমান থাকা মিলের মাধ্যমে এ বছর কোরবানির ঈদে সারা দেশে পশুর চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের নির্দেশনা দেয়া হয়। সর্বশেষ ২৩ এপ্রিল বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) আবদুল মতিন বিনামূল্যে লবণ বিতরণে জেলাভিত্তিক মনিটরিং কমিটি গঠনসহ ১১টি নির্দেশনা জারি করেন। ২০২৫ সালে মিলগুলোকে লবণ সরবরাহের স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিসিক কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে বিসিকের লবণ সেল প্রধান সরোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছরের মতো এবারো সারা দেশে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ দেয়া হবে। কোরবানির ঈদের আগে সড়কে পণ্যবাহী যান চলাচলে জটিলতা, পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে লবণের প্রকৃত দাম বেড়ে যায়। এ জন্য পূর্বাভিজ্ঞতা নিয়ে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ চামড়া শিল্পকে সহায়তা দিতে সরকার বিনামূল্যের লবণ বিতরণ অব্যাহত রাখছে। দেশব্যাপী লবণ সরবরাহের ফলে কোরবানির পশুর চামড়া যথাযথ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এজন্য ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে লবণ দিতে বিসিক দেশব্যাপী কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।